পর্ব ৫১

মোহসীন-উল-হাকিম ২০০০ সাল থেকে সাংবাদিকতা করছেন । ২০০৯ সালে আইলা ঝড়ের পরে বাংলাদেশের দেশ টিভির প্রতিবেদক হিসেবে সুন্দরবনে পৌঁছন । প্রান্তিক মানুষের জীবন জীবিকা নিয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন । সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মধ্যস্থতাতেই ৩২৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন ।

গুলিতে আহত রিপন শরীফকে একটা ছোট নৌকার ভিতরে শুইয়ে রেখেছিল সুমন বাহিনীর সদস্যরা। দোনলা বন্দুক দিয়ে গুলি করে পালিয়ে গিয়েছিল সাত্তার। সেই রাতে সুমন বাহিনীর সদস্যদের কাছে পৌঁছনোর পর আমি দেখলাম, নৌকার ভিতরে মারাত্মক ভাবে জখম অবস্থায় পড়ে রয়েছেন রিপন শরীফ। তবে নড়াচড়া করছেন, কথা বলছেন। তার সঙ্গে আমি একটু কথা বললাম। উনি সংক্ষিপ্ত ভাবে বললেন, সাত্তার কীভাবে তাকে গুলি করে চলে গেছে। ওই পরিস্থিতিতে রিপন শরীফের অবস্থা দেখে আমাদের সঙ্গে থাকা মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট রীতিমতো ভড়কে গিয়েছিলেন। কারণ, তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। তার কাছে এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। আচমকা তার পক্ষে বিষয়টা সহজ ভাবে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
দোনলা বন্দুকের গুলি লাগার পর রিপন শরীফের হাতটার কিছু ছিল না বললেই চলে। সেই অবস্থায় কী করা উচিত সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মেডিক্যাল অ্যাসিস্টেন্ট সাহস পাচ্ছিলেন না। তাঁর এমন দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থা দেখে আমাদের বেলায়েত সর্দার ট্রলার থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন। সর্দার সোজা উঠে পড়লেন রিপন শরীফের নৌকায়। তখন কাঁথা দিয়ে ঢাকা ছিল রিপন শরীফের জখম হাতটি। কাঁথা সরিয়ে দ্রুত গরম পানি আর জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে গুলিবিদ্ধ হাতটা বেঁধে ফেললেন বেলায়েত সর্দার। মানে যেমন অবস্থায় রিপনের হাতটা ছিল, তেমন অবস্থাতেই রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। বেলায়েত খুব কাছে থেকে পরিস্থিতিটা দেখেছেন, তাই আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘হাতের অবস্থা কী বুঝলেন?’’ বেলায়েত বললেন, ‘‘যা অবস্থা, তাতে ওই হাত আর চলবে বলে মনে হয় না।’’ আমি বললাম, ‘‘যাই হোক, এখনও জীবনটা আছে। সেটা তো বাঁচাতে হবে।’’


ওই জায়গায় আমরা খুব বেশি সময় ছিলাম না। দ্রুত অস্ত্র আর গোলাবারুদ জমা হলো আমাদের ট্রলারের ছাদে। আধ ঘণ্টার মতো সময় খালের মধ্যে কাটলো এসব করতে। এরপর সুমন বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সোজা আমরা পশুর নদীতে চলে এলাম। সেখানে RAB-এর ট্রলার অপেক্ষা করছিল। RAB-এর কর্তাদের আমি সব কিছু বুঝিয়ে দিলাম। মেজর সোহেল রানা ছিলেন বরিশাল RAB-এর কোম্পানি কম্যান্ডার। সুমন বাহিনীর আত্মসমর্পণের ব্যাপার নিয়ে তার নেতৃত্বেই RAB-এর দলটি এসেছিল। মেজর সোহেলকে বললাম, সুমন বাহিনীর অন্য সদস্যদের তো হেফাজতে নিয়ে নিলেন আপনারা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় থাকা রিপন শরীফকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে RAB?
মেজর সোহেল আমাকে বললেন, আহত রিপন শরীফকে নিয়ে তাদের কোনও দায়িত্ব নেই। তারা এই ব্যাপারে কোনও কিছু করতে পারবেন না। মানে রিপন শরীফকে আত্মসমর্পণ করানো হবে কিনা, কিংবা তাকে হাসপাতালে পাঠানো হবে কিনা, সে ব্যাপারে কোনও দায়িত্ব নিতে চাইলেন না মেজর সোহেল। রিপন শরীফ একজন ফেরারী আসামী। আমরা ভাবলাম, তাকে যে কোনও সময়, যে কোনও জায়গায় ধরতে পারলে হয়তো এনকাউন্টারে মেরে ফেলাও হতে পারে। ফলে এই অবস্থায় তাকে ছেড়ে আমরা যাই কী করে? সেটা সম্ভবই নয়। কী করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কারণ, জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি আগে।


যাই হোক, আমদের এক সহযোগী, মংলার মোশারফকে আমি বললাম, এই পরিস্থিতিতে তারা দায়িত্ব না নিলে রিপন শরীফের চিকিৎসার ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে। কেননা, এটা একটা মানুষের জীবন মরণের ব্যাপার। তবে তখনও আমি বুঝতে পারছিলাম না এই দায়িত্ব শেষপর্যন্ত আমরা নিতে পারবো কিনা। কারণ, রিপন শরীফকে আমরা হাসপাতালে পাঠাতে চাইছি ঠিকই। কিন্তু তিনি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় থাকা একজন দাগী জলদস্যু। তাই পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মানুষের চোখ এড়িয়ে তাকে সেই সুন্দরবন থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নেওয়া একটা বিরাট ব্যাপার। যদি একটানেও ট্রলার নিয়ে খুলনা যেতে হয়, তাহলেও তো সেটা প্রায় বারো ঘণ্টার পথ।
শেষপর্যন্ত আমরা রওনা দিয়ে দিলাম। মংলা পর্যন্ত ট্রলারগুলো একসঙ্গে এল। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। মোশারফকে একটা ট্রলার দিয়ে আহত রিপন শরীফকে খুলনা পাঠালাম। খুলনায় আমার এক সহকর্মীকে বলে দিলাম এই ব্যাপারে তদারকি করার জন্য। রিপন শরীফকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক ভাবে নেওয়া হয়। সেখানে তার চিকিৎসা হয়েছিল। এরপরে ঢাকায় এনে তাকে চিকিৎসা করানো হয়েছিল।
রিপন শরীফকে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটল ঠিকই, তবে সুমন বাহিনীর অন্য সদস্যরা পরের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। সুমন বাহিনী পূর্ব সুন্দরবনের একটা বড় দস্যুদল ছিল। তাদের আত্মসমর্পণ করার কথা ছিল অনেক আগে। বছরখানের না হলেও আট-নয় মাস আগে আমি তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। কিন্তু নানা কারণে নানা সমস্যায় আত্মসমর্পণের ব্যাপারটা হয়ে ওঠেনি। সারেন্ডার করা নিয়ে সুমন বাহিনীর গড়িমসিও ছিল। সেগুলি কাটিয়ে যখন সুমন বাহিনী সারেন্ডার করল, তখন মনে হল সুন্দরবনের একটা বড় দস্যুদল আত্মসমর্পণ করায় পূর্ব সুন্দরবনের পরিস্থিতি অনেকটাই অনুকূলে চলে এল।


জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ায় মধ্য পর্ব চলছে তখন। বেশ কয়েকটা দস্যুদল সারেন্ডার করে ফেলেছে। এরই মধ্যে সারেন্ডার করা নিয়ে সুমন বাহিনীর ভিতরে মতভেদ তৈরি হয়েছিল। দস্যু দলের একটা অংশ সারেন্ডার করতে চাইছিল। কিন্তু এই ব্যাপারে দলের ভিতরে অন্য ভাবনাও ছিল। সেসব কাটিয়ে সারেন্ডার করানো জটিল ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। ওই বাহিনীর অনেকের মনে হয়েছিল, এখন নয়, কিছুদিন পরে আত্মসমর্পণ করা যেতে পারে। আর এরই মধ্যে সাত্তারের গোলাগুলির ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল।
যাই হোক, এই সাত্তার হল একজন জলদস্যু যে দু’টো বন্দুক নিয়ে সুমন বাহিনী থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেই একজন থেকেই তৈরি হয়েছিল একটা বড় দস্যু দল, যার নাম সাত্তার বাহিনী। এই সাত্তার বাহিনীই কিন্তু সুন্দরবনের সর্বশেষ দস্যু দল, যারা আত্মসমর্পণ করেছিল। তাদের আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়েই সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছিল। সাত্তার বাহিনীর গল্প আরেকদিন করবো।
(ক্রমশ)