রামমোহন, বিদ্যাসাগরেরও আগে এই বাংলায় বিদ্যাভাসের আলো জ্বালিয়েছিলেন দুই মহিলা। লিখেছেন চণ্ডিকাপ্রসাদ ঘোষাল।

নারীশিক্ষা আন্দোলন তখনও দূর ভবিষ্যতের গর্ভে। বিদ্যাসাগর মশাই দূর অস্ত্, মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ই জন্মাবেন আরও প্রায় তিন দশক পরে। আঠেরো শতকের সেই মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গদেশের কোনও নারী বিদ্যাশিক্ষায় যে বিপ্লব ঘটাতে পারেন, এ তথ্য অবিশ্বাস্য শোনালেও ঘোর বাস্তব। একজন নয়, দুই নারী, এবং ঘটনাচক্রে দুজনেই বর্ধমান জেলার বাসিন্দা – হটী বিদ্যালঙ্কার ও হটু বিদ্যালঙ্কার।

টোল, চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত সাহিত্য, স্মৃতিব্যাকরণ, নব্য ন্যায় ইত্যাদি পাঠের সেই যুগে পরাক্রান্ত পুরুষ পণ্ডিতদের একচ্ছত্র দাপট। সেই সময়ে হটী বিদ্যালঙ্কার নামে এক মহিলা বারাণসীতে নিজস্ব আশ্রম গড়ে দলে দলে বিদ্যার্থীদের শিক্ষাদান করতেন। পুরুষতন্ত্রের সেই স্বর্ণযুগে একজন বিধবা নারীর এই অকল্পনীয় সামাজিক ভূমিকা গল্পকথার মতো শোনায়। আরও আশ্চর্যের এই যে তিনি বর্ধমান জেলার সোঞাই গ্রামের কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যা। পিতৃপরিচয় সম্যক না জানা থাকলেও তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে। শৈশবে মাকে হারিয়ে গৃহস্থালীর কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নিবিষ্ট মনে শুনতেন টোলে শাস্ত্রজ্ঞ বাবার ছাত্র পড়ানো। অল্প বয়সে বিধবা হলেও তাঁর বাবা তাঁকে সহমরণে যেতে বাধা দেন। পণ্ডিতবর্গের অনুজ্ঞা ছিল, নারীশিক্ষা বৈধব্যের কারণ। স্বামী-হারা কন্যা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘অধ্যয়নই যদি বৈধব্যের কারণ, তাহলে আমার অপরাধ কি? আমি তো ওপথে হাঁটিনি!’ সেই সর্বনাশ যখন ঘটেই গেছে, তখন আর শিক্ষালাভের পথে বাধা কোথায়?
শুরু হল পিতার কাছে কন্যার নিয়মমাফিক সংস্কৃত ব্যাকরণ ও কাব্যশাস্ত্রপাঠ। কিন্তু অচিরেই পিতৃবিয়োগের ফলে মহা আতান্তরে পড়তে হল হটীকে। অর্থোপার্জনের জন্য টোলের ছাত্রদের পড়ানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেই স্থানীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ক্ষেপে উঠলেন। মেয়েদের বিদ্যার্জনই যেখানে অনাচার, সেখানে বিদ্যাদানের স্পর্ধা হয় কী করে! টোল খালি হয়ে গেল। একদিকে অর্থাভাব, অপরদিকে সমাজের বিরুদ্ধাচার। অসহায় অথচ জেদি মেয়েটি কাশী চলে যায়। সে সময়ে বিধবা মেয়েদের জন্য কাশীবাসই ছিল একমাত্র পথ। কিন্তু সেখানে গিয়ে হটী বৈধব্য জীবন ঈশ্বরের পায়ে সমর্পণ করেননি। আত্মশক্তিতে বলবতী হয়ে স্মৃতিব্যাকরণ ও নব্য ন্যায়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তারপর একটি চতুস্পাঠী গড়ে তুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। দেশ-দেশান্তর থেকে শিক্ষার্থীদের ভিড় জমতে থাকে। পুরুষ পণ্ডিতদের সঙ্গে বিভিন্ন তর্কসভাতেও তিনি শামিল হতেন এবং চতুষ্পাঠীর পণ্ডিতদের মতো দক্ষিণা নিতে কসুর করতেন না।

বারাণসীর পণ্ডিত সমাজ তাঁকে ‘বিদ্যালঙ্কার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
শ্রীরামপুর মিশনের উইলিয়াম ওয়ার্ডের লেখা Accounts of the Writings, Religion and Manners of the Hindoos বইটির প্রথম খণ্ডে (জানুয়ারি ১৯১১, পৃ.১৯৫-৯৬) তৎকালীন প্রখ্যাত পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের পাশাপাশি হটী বিদ্যালঙ্কারের নামের উল্লেখ রয়েছে। তর্কপঞ্চাননের মৃত্যুর তিন বছর পর, ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে কাশীতে হটী বিদ্যালঙ্কারের প্রয়াণ ঘটে।

তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পরে, ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানেরই কলাইঝুটি গ্রামে এক বৈষ্ণব পরিবারে হটু ওরফে রূপমঞ্জরীর জন্ম। বয়সে তিনি রাজা রামমোহন রায়ের চেয়ে বছর তিনেকের ছোট। মেয়ের অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধি দেখে বাবা নারায়ণ দাস প্রথামাফিক তার বাল্যবিবাহ দিতে নারাজ হন। পরিবর্তে তাঁকে ব্যাকরণ, সাহিত্য, নব্য ন্যায়, বৈদ্যকশাস্ত্র (আয়ুর্বেদ) ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন। এরপর কন্যার ১৬-১৭ বছর বয়সে নারায়ণ দাস তাঁকে কাছাকাছি এক গ্রামের বৈয়াকরণের কাছে ব্যাকরণ পাঠ করার জন্য পাঠিয়ে দেন। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে বিদ্যার্জন করার ফলে তাঁর মধ্যে পুরুষ স্বভাবের প্রভাব পড়ে। ফলে পুরুষদের মতোই মাথা ন্যাড়া, শিখা ধারণ, উত্তরীয় ও উপবীত এবং পায়ে খড়ম পরায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। সংস্কারমুক্ত ছিলেন বলেই সেই অধ্যাপক শুধু পড়াতেই রাজি হননি, ছাত্রদের সঙ্গেই তাঁকে পাঠাভ্যাসে অভ্যস্ত করে তোলেন। নিজের বাড়িতে, নিজের মেয়ের মতো করে।

ইতিমধ্যে বাবার মৃত্যু হলে পারলৌকিক ক্রিয়ার জন্য হটুকে বাড়ি ফিরতে হয়। কিছুদিন পর আবার গুরুগৃহে প্রত্যাবর্তন। সেখানকার পড়া শেষ হলে তিনি আচার্য গোকুলানন্দ তর্কালঙ্কার নামে এক অধ্যাপকের কাছে সাহিত্য অলঙ্কার পাঠ সমাপ্ত করে চিকিৎসাশাস্ত্র শিক্ষা নেন। এ জন্য চরক, সুশ্রুত, নিদান ইত্যাদি বিষয়েও বিদ্যার্জন করেন। এরপর তিনি ‘বিদ্যালঙ্কার’
উপাধি লাভ করেন। অতঃপর বাবা-মায়ের পিণ্ডদান করতে তিনি গয়া রওনা হন। পুরুষবেশী, স্বভাবগম্ভীর, চিরকুমারী হটু বিদ্যালঙ্কারকে সবাই সমীহ করতো। কাশীতে গিয়ে তিনি দণ্ডীদের কাছে নানা শাস্ত্রপাঠ করেন। তাঁর একাগ্রতা, আন্তরিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা মানুষের বিপুল শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল।
স্বদেশে ফিরে তিনি চতুস্পাঠী খুলে বসেন। ছাত্রদের শিক্ষাদান করতে করতে তাঁর মনে হল, এ যথেষ্ট নয়। আরও বেশি সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন। অভাবগ্রস্ত, রোগগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। সুতরাং শুরু করলেন চিকিৎসার মাধ্যমে জনসেবা। পাশাপাশি চললো ব্যাকরণ এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে বিদ্যাদানও। দূরদূরান্ত থেকে কবিরাজরাও তাঁর পরামর্শের আশায় হাজির হতেন। প্রায় ১০০ বছর বয়েসে তিনি পরলোক গমন করেন।

ব্রাহ্মণ পণ্ডিত-বেশধারী এই বিদ্যাবতীর রাধারমণ দাস নামে এক পালিতপুত্র ছিল। তিনি আজীবন রূপমঞ্জরীর বর্ধমানের বাড়িতেই থাকতেন। কে বলতে পারে, এক প্রতিবাদী চিরকুমারীর এই পুরুষ-বেশ ধারণ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে জীবনব্যাপী জেহাদ নয়?

তথ্যপঞ্জি
১. সাহিত্যসাধক চরিতমালা(৮৯): ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
২. রূপমঞ্জরী: নারায়ণ সান্যাল
৩. সেকাল আর একাল: রাজনারায়ণ বসু