সঞ্জয় গুপ্ত

…sorry, mom and dad for whatever I did but I have no other choice other than this. I am unable to pay other loans that are there in my name and this is my final decision. Goodbye…

এটা একটা সুইসাইড নোট। বাইশ বছরের এক যুবকের। বেঙ্গালুরু শহরের ইয়েলাঙ্কা নামের একটি জায়গায়, Nitte Meenakshi কলেজে মেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়েছিলেন তেজস নায়ার। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে, এই পড়ুয়ার আত্মহত্যার পর, এই চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল সুইসাইড নোট হিসেবে। বাবা গোপীনাথ নায়ার জানিয়েছিলেন, তেজস টাকা ধার নিয়েছিলেন। তিরিশ হাজার টাকা। সুদে আসলে সেটা দাঁড়িয়েছিল ৪৫ হাজার টাকায়।

এই টাকা তিনি ধার করেছিলেন অনলাইনে, একটি চিনা অ্যাপ ডাউনলোড করে। চিনা অ্যাপের কর্মীরা ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। পরিচিতদের কাছে তেজসের আপত্তিকর ফটো পাঠাচ্ছিল তারা। গোপীনাথ নিজেও কথা বলেছিলেন ফোনে ওদের সঙ্গে। বলেছিলেন, কিছুটা সময় দিতে। কিন্তু তারা চাপ কমায় নি। ফোন করে রোজ হুমকি দিতো। এই চাপ তেজস নিতে পারেনি। তেজসের মৃত্যুর পর একটি এফআইআর রুজু হয়েছে Jalahalli পুলিশ স্টেশনে। তেজস যে চিনা অ্যাপ থেকে লোন নিয়েছিল, সেটির নাম হচ্ছে “Slice and Kiss” ।

এবার অন্য একটি ঘটনা। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের বাসিন্দা অমিত যাদব তাঁর স্ত্রী এবং দুই শিশু সন্তানকে মেরে আত্মহত্যা করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি সুইসাইড নোটে লিখেছিলেন, আমি খারাপ লোক নই। আমিও বাঁচতে চাই। কিন্তু অনেক চিনা অ্যাপ থেকে— যেমন, true balance, mobi pocket, money view, smart coin, rufilo থেকে লোন নিয়েছি, যা ফেরত দিতে পারছি না। নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য আমি আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এরকম অজস্র ঘটনা ঘটছে পুরো ভারত জুড়ে। তেলেঙ্গানা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টুইট করে জানিয়েছিলেন এরকম একটি পরিবারের পাশে তাঁর দাঁড়ানোর কথা। লিখেছিলেন, “The Chinese loan App Scam that took the precious life of Chandramohan had left a deep void in the life of Sarita and their daughters. Today, I met the family and extended my support to them.’’

২০২১ সালের দুই জানুয়ারি, লোন শার্ক দের অত্যাচারে, জি চন্দ্রমোহন আত্মহত্যা করেছিলেন, স্ত্রী এবং তিনটি শিশু কন্যাকে ফেলে রেখে। তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন, আশি হাজার টাকা ধার করেছিলেন ৩৬ বছরের চন্দ্রমোহন। ফেরত দিয়েছিলেন প্রায় তিন লাখ টাকা। মারা যাওয়ার পরেও নিস্তার মেলেনি পরিবারের। ফোনে হুমকি আসছে।

সুমি নামে কেরালার একটি মেয়েও আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল। শুধু সেই মেয়েটি নয়, তদন্তকারীদের ধারণা, আরও অন্তত সত্তর জন এ ভাবে আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের আত্মহত্যা করার কারণ, অপমান সহ্য করতে না পারা।

ব্যাপারটি শুরু করার সিস্টেম কিন্তু খুব সাধারণ।
মেসেজ আসে মোবাইলে।
“আপনার কি টাকার দরকার আছে? লাগলে বলবেন। এক্ষুনি টাকা খুব সহজ শর্তে পেয়ে যাবেন।”

অনেকেরই দরকার পরে। কারও খুব দরকার। কেউ এমনিই লোন নিতে চান। ব্যাপারটা সত্যিই খুব সহজ। একটা অ্যাপ ডাউনলোড করতে হয়। ব্যাংক ডিটেইলস দিতে হয়। এবং ফোনের লোকেশন আর সেই সঙ্গে ফটো থেকে শুরু করে কন্টাক্ট ডিটেইলস শেয়ার করার অনুমতি দিতে হবে। না, এটা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা যাওয়ার ব্যাপার নয়। সত্যি সত্যিই টাকা ব্যাঙ্কে আসে। অনলাইনে। খেলাটা শুরু তারপর।

একজন ভুক্তভোগী ভদ্রমহিলার গল্প শোনাবো। ডিভোর্সী, একটি মাত্র কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। কয়েকদিনের জন্য তাঁর টাকার দরকার হয়েছিল। ব্যাঙ্কে টাকা এলো। প্রথম দেখা গেল , যত টাকা লোন হিসেবে আসার কথা, এসেছে তার থেকে বেশ কিছুটা কম। ওগুলো কী সব চার্জ হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে। প্রতি সাত দিন পর পর কিস্তি দেওয়ার কথা। প্রথম পাঁচদিন পরেই তাগাদা এলো। দু-তিন সপ্তাহ পর কিস্তি দিতে দেরি হলো। ফোনে গালির বন্যা। ওই ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে আরও একটি লোন নিতে হলো। সেটায় ডিফল্ট। সেটা মেটাতে আরও একটি। গালির বহর বাড়ছে। এর পর হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে, তোর সব চেনা লোককে ফোন করে বলছি। লোক পাঠাচ্ছি তোর বাড়িতে। দরকারে সোনা বিক্রি কর, জমি বিক্রি কর, নিজেকে বিক্রি কর। কিন্তু টাকা দে। এর পর আরো ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

ফটো শপ করে ভদ্রমহিলার অশ্লীল ছবি WhatsApp এর মাধ্যমে পাঠানো হল তাঁর মোবাইলে। বাড়ির সব কিছু বিক্রি করে টাকা মেটালেন। তার পরেও সেই সব ছবি তার কর্মস্থলের সহকর্মী, মেয়ের বন্ধুর ফোনে পাঠানো হয়েছিল । ভদ্রমহিলা বলেছেন— জানি, সবাই বুঝেছে ওগুলো morphed ছবি। কিন্তু তারপরেও আমি ঘর থেকে বার হতে ভয় পেতাম। মেয়ের বয়সি ছেলেদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতাম না। কতবার ভেবেছি আত্মহত্যা করি। শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে, মেয়ের কথায় জোর পেয়ে বেঁচে আছি। এবার লোন দেওয়া ও তার পিছনের কাজকর্মের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

যারা টাকা দিচ্ছে, তারা নিজেরা লোক পুষছে। কখনো ভাড়ায় কল সেন্টার থেকে সার্ভিস নিচ্ছে। এই কল সেন্টারে কাজ করা লোক, মেয়েদের কাজ হচ্ছে তাগাদা দেওয়া। টাকা আদায় করার জন্য সব রকমের গালিগালাজ, ব্ল্যাকমেল করার ফন্দি ফিকির নেওয়া। এর সাফল্যের উপর ভর করে বোনাস, এক্সট্রা রোজগার।
কারা দেয় টাকা?

এমনই একটা ঘটনার তদন্তের সূত্র পৌঁছে গিয়েছিল সিঙ্গাপুর পর্যন্ত। সেখানকার কোম্পানি থেকে ঘেঁটে ঘুটে দেখা গিয়েছিল টাকা এসেছে চিনের কিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। ওদিকে অনেক লোকের কাছেই প্রচুর নগদ টাকা। সে সব, এই রকম কিছু জাল কোম্পানি খুলে, টাকা খাটানো।

কিন্তু , এসবে মূল ভূমিকা ভারতেরই কিছু লোকের। ওই টাকা দেওয়ার জন্য অফিস খোলা, তাগাদা দেওয়ার কাজটি এখানেই হচ্ছে। শুনলে তাজ্জব লাগবে, একটি কোম্পানির এরকম তাগাদা দেওয়ার ফোন কল রেকর্ডিং করে রাখা হয়েছিল। কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করতেই জবাব দেওয়া হয়েছিল, আমরা দুঃখিত। সেই কর্মচারীকে ওয়ার্নিং দেওয়া হয়েছে। একজন নামকরা খেলোয়াড় সেই কোম্পানির হয়ে বিজ্ঞাপন করেছিলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে বিখ্যাত টিভি চ্যানেল এই ব্যাপারটি নিয়ে তদন্ত মূলক প্রতিবেদন বানিয়েছিল। তিনি অবশ্য জবাব দেননি।

পুলিশ অভিযোগ পেলে তদন্ত করে। কোম্পানির লোকেরা গ্রেফতার হয়। ফের জামিনে মুক্তি পায়। পুরনো কোম্পানি বদলে নতুন কোম্পানি হয়। ব্যবসা চলতে থাকে। নতুন লোকেরা শিকার হয়। কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ কেউ সারা জীবনের জন্য ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে যায়।

এমন নয়, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া চেষ্টা করেনি এই অ্যাপ গুলোর ব্যবসা রুখতে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী, শুধু সেই কোম্পানি গুলি অনলাইনে লোন দিতে পারবে, যারা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নথিভুক্ত। প্রথমে না বলে, লুকিয়ে কোনও রকমের চার্জ কেটে নিতে পারবে না। এরা কোন লোন গ্রহীতার ব্যক্তিগত তথ্য নিজেদের সংগ্রহে রাখতে পারবে না। লোন ফেরত পাওয়ার পর, সব তথ্য ডিলিট করে দিতে হবে। তবে নিয়ম নীতি মেনে কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

বিভিন্ন ধরনের লোন অ্যাপ চিন আর হংকং শহরে তৈরি করা হয়। তারপর তাদেরকে দিয়ে দেওয়া হয় গুগল প্লে স্টোরে। তারপর মেসেজ পাঠানো শুরু বিভিন্ন লোকের কাছে। মেসেজে লিংক থাকে লোনের অ্যাপের। যাঁরা এই অ্যাপ ডাউনলোড করেন, এই অ্যাপকে তাঁদের অনুমতি দিতে হবে— ব্যক্তিগত তথ্য, গ্যালারি আর কন্টাক্ট লিস্টের। তারপর লোন চাইলে প্রথমে একটা মোটা টাকা কেটে নেবে প্রসেসিং চার্জ হিসেবে। ধরুন দশ হাজার টাকা চাইছেন। প্রথমে দুই থেকে তিন হাজার টাকা কেটে নেবে। তারপর সুদ। দেখতে দেখতে সেই সুদের হার বেড়ে চলে যাবে ৩৬ শতাংশে। পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা ধার নিয়ে অনেককে ফেরত দিতে হয়েছে এক লাখ টাকা। এই অ্যাপ গুলোর রমরমা বেড়েছে কোভিড এবং তার পরবর্তী সময়ে।

একজন পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, এরকম হলে সবচেয়ে প্রথমে নিজের ফেসবুকে, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করবেন, আপনার ফোন হ্যাক হয়ে গেছে বলে। আপত্তিকর ছবি, আসতেই পারে। সেটা আপনার নয়। তারপর অতি অবশ্যই পুলিশে কমপ্লেন করবেন। সবচেয়ে ভালো হচ্ছে, ফোনে লোন নেবেন না। একদম নয়।

জাতীয় ব্যাঙ্কে যান। প্রচুর সময় লাগবে হয়তো। কর্মচারীদের কেউ কেউ হয়তো ঋণ গ্রহীতাকে বন্ধুত্বপূর্ণ চেহারায় দেখেন না। দেখতে চান না।

তবু…।

অলংকরণ – রাতুল চন্দরায়